সুমেরু প্রভা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে গ্যাসীয় কণাগুলোর সাথে সূর্যের সংঘর্ষের কারণে চার্জযুক্ত কণার ফলাফল। বায়ুমণ্ডলের থার্মোস্ফায়ারে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে ম্যাগনোটোস্ফিয়ার থেকে আসা চার্জিত ইলেক্ট্রন ও প্রোটন কণার ঘর্ষণের ফলে সুমেরু প্রভা বা অরোরা বোরিয়ালিস সৃষ্টি হয়। একে নর্দান লাইটও বলা হয়। সংঘর্ষের ফলে চার্জিত কণাসমূহ থেকে পরমাণু কণাসমূহ কিছু শক্তি লাভ করে। এই অভ্যন্তরীণ সঞ্চিত শক্তি যখন আলোকশক্তি হিসেবে বিকিরত হয় তখনই অরোরা বোরিয়ালিস বা সুমেরু প্রভা দেখা যায়। বিশেষ করে নরওয়েতে সুমেরু প্রভা দেখা যায়।
নরওয়ে ছাড়াও সুইডেন, কানাডা, আলাস্কা, ফিনল্যান্ড, রাশিয়, গ্রীনল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ইত্যাদি দেশে সুমেরু প্রভা দেখা যায়। এসব দেশে বছরে ছয় মাস সুমেরু প্রভা দেখা যায়। যখন সুমেরু প্রভা দেখা যায় তখন এক অন্যরকম স্নিগ্ধ আবহাওয়া উপলব্ধি হয়। যেন স্নিগ্ধতার পরশে ভেসে যায় জনপদ। এই মহাজাগতিক আলোর খেলা সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত উপভোগ করা যায়। আসুন জেনে নিই যে দেশগুলোতে ভ্রমণ করে আপনি এই মহাজাগতিক আলোকরেখা অর্থাৎ সুমেরু প্রভা উপভোগ করতে পারবেন সে দেশগুলো সম্পর্কে।
আইসল্যান্ড
পৃথিবীর যে দেশগুলোতে অবস্থান করে আপনি মহাজাগতিক আলোর রেখা অথবা সুমেরু প্রভা উপভোগ করতে পারবেন তার মধ্যে আইসল্যান্ড অন্যতম। আইসল্যান্ডের যেকোনো স্থানে অবস্থান করে আপনি সুমেরু প্রভার স্নিগ্ধ আলোয় নিজের চোখকে প্রশান্তি দিতে পারেন। তবে পিংভেলার ন্যাশনাল পার্কের খোলা সমতল ভূমি সুমেরু প্রভা উপভোগ করার জন্য জনপ্রিয় স্থান। প্রতিবছর এখানে ভিড় জমায় হাজারো দর্শনার্থী। ইউনেস্কো একে বিশ্বের দর্শনীয় স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আইসল্যান্ডে প্রতি বছর অনেক ভ্রমণ পিপাসু পর্যটক যায় এবং সাশ্রয়ী ও স্বল্প খরচে ভ্রমণ করতে পারে।
ফিনল্যান্ড
ফিনল্যান্ডে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো অনেক বন ও জঙ্গল রয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর মতো এটি অন্যতম। ফিনল্যান্ডের যেকোন প্রান্তে বসে আলোকরশ্মি অর্থাৎ অরোরা বিরোয়ালিস উপভোগ করা যায়। প্রতি বছরে ২০০ এর বেশি রাত সুমেরা প্রভার আলোক রেখায় মহিমান্বিত হয়। স্থানীয় দর্শনার্থীরা এই আলোক রেখায় মুগ্ধ হয় প্রতিনিয়ত। লোস্টোতে হোটেল অরোরায় প্রতিটি অতিথিকে অ্যালার্মের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যখন নর্দান লাইটস রিসার্চ সেন্টার দেখে নর্দান লাইট দেখা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রদান করে। আপনি যদি আরো অভিজ্ঞতা নিতে চান তাহলে কাকলটটিন আর্কটিক রিসোর্টে থাকতে পারেন যেখানে চমৎকারভাবে আলোক রেখা দেখতে পাবেন।
সুইডেন
সুইডিশ ল্যাপল্যান্ড তার অনন্য মাইক্রোক্লিমেট এর কারণে বৈজ্ঞানিকভাবে একটি আদর্শ দর্শনীয় স্থান বলে প্রমাণিত। এখানে শীতকালের রাতগুলোতে গাঢ় অন্ধকার থাকে এবং ৪৩ মাইল (৭০ কিঃমিঃ) দীর্ঘ টর্নেট্রাস্ক লেক অবিশ্বাস্য নীল আলোক রশ্মি সৃষ্টিতে সহায়তা করে। খোলা আকাশ যেন নির্বিশেষে আলোক রশ্মি বিলিয়ে যায় সুইডেনের পথে পথে। সুইডেনে গিয়ে কিরনা অঞ্চলের জুক্কাসজাভেরি গ্রামে থাকতে পারেন। সুমেরু প্রভা উপভোগ করার জন্য সুইডেন অনন্য একটি দেশ।
আলাস্কা
আলাস্কা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য। আলিউট আলিয়েস্কো ভাষা হতে আলাস্কা শব্দটি নেয়া হয়েছে যার অর্থ বিশাল দেশ বা মহান দেশ অথবা ভূখন্ড। সুমেরু প্রভা আলাস্কার ফেয়ারবাঙ্কস, আলাস্কার অন্যান্য অঞ্চ্ল এবং দেনালি, ইউকোন থেকে দেখা যায়। অবস্থানগত কারণে চমৎকার অরোরা বোরিয়ালিস অর্থাৎ সুমেরুপ্রভা দেখা যায়। অরোরা বিরোলিয়াস দেখার জন্য উৎকৃষ্ট যেসব দেশ রয়েছে তার মধ্যে আলাস্কা অন্যতম।
কানাডা
ইয়েলোলাইফ ও হোয়াইটহর্স শহর থেকে দীপ্তিময় আলোর রেখা সুন্দরভাবে দেখা যায়। সুমেরু প্রভাকে উত্তরের দেশগুলো বলে নর্দান লাইট এবং দক্ষিণের দেশগুলো বলে সাউদার্ন লাইট। তবে সকলের কাছে নর্দান লাইট বলে বেশি পরিচিত। কানাডায় চমৎকারভাবে আলোক রশ্মি দেখা যায় যা একজন দর্শনার্থীকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে। দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটানো যায় এই আলোর রেখা উপভোগ করতে করতে। অন্টারিওর অলিম্পিক লেকের সুপিরিয়রের চারপাশের এলাকা এবং উত্তর কানাডার টুন্ড্রা সুমেরু প্রভা উপভোগ করার জন্য প্রধান দর্শনীয় স্থান।
নরওয়ে
মহাজাগতিক আলোর রেখা সবচেয়ে বেশী দেখা যায় নরওয়েতে। বছরের ছয় মাস এই আলোক রশ্মির জন্য খ্যাত। নরওয়ের আকাশ যেন বর্ণিল আলোকরশ্মিতে ভরে ওঠে সন্ধ্যার আবেশে। নরওয়েতে রয়েছে রুপকথার গল্পের মতো সমুদ্র, তুষার ঢাকা বিস্তৃত মালভূমি ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থান। প্রতি বছর হাজারো পর্যটক নরওয়ের রাস্তায় ভিড় জমায় এর চমৎকার দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখার জন্য। এছাড়া নরওয়েতে রয়েছে হাজার হাজার নয়নাভিরাম হ্রদ এবং এসব হ্রদে পাওয়া যায় স্যামন মাছ। জেলেদের সারি সারি কেবিন রয়েছে হ্রদের কিনারা জুড়ে।
রাশিয়া
উত্তর রাশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে সুমেরু প্রভা দারুণভাবে উপভোগ করা যায়। রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপটি সুমেরু প্রভা দেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। শীতকালের নিম্ন তাপমাত্রা সামলে নিতে পারলে আপনি মারম্যাস্ক শহরে বসবাস করতে পারেন।
গ্রীনল্যান্ড
আইসল্যান্ডের মতো গ্রীনল্যান্ডেও আপনি সুমেরু প্রভা দেখতে পাবেন। বিস্ময়কর সুমেরু প্রভা দেখার জন্য অসংখ্য পর্যটক পাড়ি জমায় গ্রীনল্যান্ডে। বিজ্ঞান বলে সুমেরু প্রভা বা আলোকরশ্মি সৃষ্টি হয় বায়ুমন্ডলীয় বিভিন্ন গ্যাসীয় কণাগুলোর ঘর্ষণের
ফলে, পূর্বে স্থানীয় অনেকে মনে করতেন সুমেরু প্রভা সৃষ্টি হয় পূর্বপুরুষের আত্মা থেকে। তারা ভাবতেন, ওয়ার্লাসের খুলি দিয়ে পূর্বপুরুষের আত্মারা আকাশে ফুটবল খেলতেন। তাই আকাশে সুমেরু প্রভা দেখা যায়।
স্কটল্যান্ড
ব্রিটিশ এলাকাগুলো আপনার প্রধান গন্তব্যস্থল থেকে দূরে রাখুন কারণ সেসব অঞ্চলগুলোতে ঝড়, বৃষ্টি ও মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশ থাকে। শীতের রাতে আকাশ যখন পরিষ্কার থাকে তখন স্কটল্যান্ডের আকাশে দেখা যায় বর্ণিল আলোর রেখা যা সুমেরু প্রভা হিসেবে পরিচিত।
ডেনমার্ক
যদিও ডেনমার্কে ঝড়, বৃষ্টি হয়, যদিও এখানে আর্দ্র আবহাওয়া বিদ্যমান তবুও শীতকালে ডেনমার্কে প্রতিফলিত হয় সুমেরু প্রভা যা নর্দান লাইট হিসেবে খ্যাত।